বাংলাদেশের...

ভারতীয় হাই কমিশন

ঢাকা 

বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ ও সশস্ত্র বাহিনির যুদ্ধবিষয়ক কলেজেসমসাময়িক ভারত, তার পররাষ্ট্র নীতি, নিরাপত্তা উন্নয়ন কৌশল এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কবিষয়ে ভারতীয় হাই কমিশনার-এর ভাষণ

[ঢাকা, ১৮ জুলাই ২০১৭]

 

  • লেফট্যান্যান্ট জেনারেল চৌধুরী হাসান সরওয়ার্দি, বীর বিক্রম, কমান্ড্যান্ট, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ;
  • ঊর্ধ্বতন পরিচালন স্টাফ, স্টাফ সদস্যবৃন্দ ও অনুষদ;
  • এনডিসি কোর্স ও সশস্ত্র বাহিনির যুদ্ধবিষয়ক কলেজর সদস্যবৃন্দ;
  • ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ; 

আপনাদের সবাইকে নমস্কার, আসসালামু আলাইকুম ও শুভ সকাল। 

আজ এখানে উপস্থিত হতে পারা আমার জন্য একটি সম্মানের বিষয়। ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে এনডিসি কোর্সে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার জন্য এটা আমার দ্বিতীয়বার আগমন। প্রতিটি পরিদর্শনই উদ্দীপনাময় এবং প্রতিবারই আমি অংশগ্রহণকারীদের ধারালো প্রশ্ন ও সারগ্রাহী মতবিনিময় থেকে উপকৃত হয়েছি। ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ পরিদর্শন এবং এনডিসি ও সশস্ত্র বাহিনির যুদ্ধবিষয়ক কলেজর অত্যন্ত দক্ষ অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখার সুযোগ তৈরি করে দেয়ার জন্য আমি কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল সরওয়ার্দিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। 

আজকের আলোচনার নির্বাচিত বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘সমসাময়িক ভারত, তার পররাষ্ট্র নীতি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কৌশল এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক’। আমার বক্তব্যে, আমি ভারতের বৈদেশিক নীতির সাম্প্রতিক অগ্রগতির উপর আলোকপাত করব যা পৃথক পৃথকভাবে ভারতের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমার বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশে আমি বিশেষভাবে এ বছর এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরের প্রেক্ষিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করব।

 

.        ভারতের পররাষ্ট্র নীতি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন কৌশল 

ভারতের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে একটি উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করাও ভারতের বৈদেশিক নীতির প্রধান লক্ষ্যগুলির অন্যতম। এর অর্থ হচ্ছে এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যাতে করে আমাদের কর্মশক্তি উন্নয়নমুখী হয়; অর্থাৎ এমনভাবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা যা আমাদের জনগণের প্রয়োজনগুলো পূরণ করবে। 

ভারত, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ‘সবার আগে প্রতিবেশী’ নীতি গ্রহণ করেছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র নীতির লক্ষ্যসমূহ প্রতিবেশী দেশগুলির পররাষ্ট্র নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আমাদের মধ্যে সহযোগিতার যে-সব উপাদান রয়েছে আমাদের উচিত সেগুলোকে কাজে লাগানো। আমাদের পণ্য ও জনগণের নিরবিচ্ছিন্ন চলাচলের জন্য উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পাশাপাশি আমাদের কৌশলগত ও নিরাপত্তা স্বার্থসমূহ নিয়েও আমাদের কাজ করা প্রয়োজন। 

বর্তমান সরকারের আমলে, ভারত আমাদের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য কূটনীতিতে এক সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে উৎপাদন খাতে সরাসরি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। গত দু’বছর ধরে গ্রিনফিল্ড এফডিআই-এর সর্ববৃহৎ গ্রহীতা হচ্ছে ভারত। ২০১৬ সালে ভারত প্রায় ৬ হাজার ৫শো কোটি মার্কিন ডলার সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ হিসেবে পেয়েছিল। গত তিন বছরে, ভারতে বৈদেশিক বিনিয়োগ ৩৭ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একটি রেকর্ড। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে আমরা যখন ঘরোয়াভাবে সংস্কার ও নীতিমালা উদারীকরণ করেছি, বাহ্যিকভাবে, আমাদের উন্নয়নমুখী বৈদেশিক নীতি সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের এই লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। 

স্বাধীনতার পর ভারত ১ জুলাই থেকে সর্ববৃহৎ কর সংস্কার কার্যকর করেছে। পণ্য ও সেবা কর বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে এক জাতি-এক কর-এক বাজারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন। ভারতকে একটি অভিন্ন বাজারে পরিণত করা এবং বাণিজক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বাধা দূর করা এই উদ্যোগের লক্ষ্য। এই সংস্কার কার্যকর করায় আমাদের নীতিনির্ধারকদের প্রচেষ্টাও ছিল ‘ব্যবসা করা সহজ’-কে বেগবান করা। 

সামাজিক ও ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে আমরা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কয়েকটি ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এই কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে স্মার্ট সিটিজ, স্কিল ইন্ডিয়া, ডিজিটাল ইন্ডিয়া, মেক ইন ইন্ডিয়া ইত্যাদি। আমাদের বৈদেশিক নীতি প্রধান ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পগুলির কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করছে। 

বিদেশে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ ভারতীয়ের কল্যাণও আমাদের কূটনীতিতে একটি নতুন মূলমঞ্চ হয়ে উঠেছে। আমাদের উভয় দেশেরই জনগণেরএকটি বড় অংশ বিদেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বসবাস ও কাজ করছে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সময়গুলোতে আমাদের নাগরিকরা বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছে। গত তিন বছরে ইরাক, ইয়েমেন ও সিরিয়ার বিভিন্ন সংঘর্ষপূর্ণ এলাকা থেকে ৮০০০০-এরও বেশি মানুষকে সরিয়ে এনেছি এবং আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এইসব কার্যক্রমের পুরোভাগে রয়েছে। 

অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, হতে পারে তা সন্ত্রাসবাদ অথবা জলবায়ু পরিবর্তনÑ বৈশ্বিক বিষয়সূচি নির্ধারণে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করা আমাদের বৈদেশিক নীতির অন্যতম লক্ষ্য। জাতি হিসেবে আমরা পরিবেশগত সুরক্ষা ও সংরক্ষণের মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং আমরা জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ সক্ষমতা অর্জনে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সৌরশক্তি প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ব্যয় হ্রাসের মধ্য দিয়ে তা অর্জনে আমরা ভালভাবেই এগিয়ে যাচ্ছি। 

সন্ত্রাসবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা যা আমাদের সকলকে প্রভাবিত করে এবং এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হুমকিগুলির একটি। নিরাপত্তা হুমকির বিশ্বায়ন; সন্ত্রাসী-অর্থায়ন অথবা ভৌত নেটওয়ার্ক, যা সীমানা অতিক্রম করে রাষ্ট্রগুলিকে তাদের সম্পদ সংগ্রহ এবং এই সমস্যাগুলি কাটিয়ে ওঠার জন্য একে অপরকে সহযোগিতার আহ্বান জানাচ্ছে। এটি সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিশেষ অথবা আংশিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করতে এবং জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সভা অনুমোদন ও তা দ্রুত চূড়ান্ত করারও আহ্বান জানাচ্ছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সন্ত্রাসী, সন্ত্রাসী সংগঠন এবং নেটওয়ার্কগুলি ভেঙে দেয়া বা নির্মূল করাই নয় বরং যেসব রাষ্ট্র ও সংস্থা যারা সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত ও সমর্থন করেছে এবং এতে অর্থায়ন করেছে, সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে ও তাদের গুণাবলীর মিথ্যা প্রশংসা করেছে তাদের সকলকে চিহ্নিত করা,  দায়ী করা ও তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে ভারতের রয়েছে শূন্য-সহনশীলতা এবং এ বিষয়ে আপনাদের প্রচেষ্টাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। 

ভারত ও বাংলাদেশের সকল পর্যায়ে চমৎকার নিরাপত্তা সহযোগিতা রয়েছে। ৪০০০-এরও বেশি দৈর্ঘ্যরে সীমান্ত পাহারা দিতে গিয়ে আমাদের সীমান্তরক্ষীদের প্রায়শই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে হয়। আমাদের দুটি দেশের মধ্যে স্থলসীমান্ত ও সমুদ্রসীমার সীমানা নির্ধারণ আমাদের নিরাপত্তা বাহিনির মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি ও তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এগুলির মধ্যে রয়েছে সাইক্লোন মোরা-য় আক্রান্ত হওয়ার পর ভারতীয় নৌবাহিনীর উদ্ধার অভিযান যেখানে ভারতের সমুদ্রসীমায় প্রহরারত জাহাজ আইএনএস সুমিত্রা ৩২জন বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধার করেছিল। গত বছর আমাদের উপকূলরক্ষীদের পরিচালিত যৌথ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানগুলো সমুদ্রে আটকে পড়া অনেক জেলের জীবন বাঁচিয়েছে। স্থলসীমান্তে বিএসএফ এবং বিজিবি-র মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অপরাধমূলক কর্মকা- নিয়ন্ত্রণে এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। নিরাপত্তা আমাদের সহযোগিতার শক্তিশালী ক্ষেত্রগুলোর অন্যতম এবং আমাদের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনির মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। এরই সঙ্গে আমি আমার বক্তব্যের শেষ প্রান্তে চলে এসেছি এবং এখন আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সাম্প্রতিক উন্নয়নগুলির উপর আলোকপাত করব। 

.        ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর 

বলা নিষ্প্রয়োজন যে, আমাদের বৈদেশিক নীতি অন্য দেশের মত আমাদের নেতৃত্বের দ্বারা পরিচালিত। উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিনিময় আমাদের সম্পর্কে নতুন গতিবেগ সঞ্চার করেছে। ২০১৫ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী মোদির বাংলাদেশে ঐতিহাসিক সফরের সময় ঐতিহাসিক স্থল সীমানা চুক্তিসহ ২২টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সফরে ২০১৫ সালে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের বাস্তবায়নের অগ্রগতি দেখার সুযোগ হয়েছে। এই সফর উভয় দেশের মধ্যে সৌভ্রার্তৃত্বের বন্ধন নিশ্চিত করে এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের বাইরে এক সর্বব্যাপ্ত অংশীদারিত্ব দিয়ে আমাদের সম্পর্কে এক সোনালি অধ্যায়ে সূচনা করেছে। সংযোগ, উন্নয়ন ও অবকাঠামোর বিভিন্ন ক্ষেত্র, তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, মহাকাশ, বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি প্রভৃতির মত ক্ষেত্রে আমাদের অংশীদারিত্ব জোরদার করে তাঁর সফরকালে রেকর্ডসংখ্যক ৩৬টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক রয়েছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, লজিস্টিকস, শিক্ষা ও মেডিক্যাল সেক্টরের মত ক্ষেত্র যেখানে ভারতীয় সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিসমূহ ১ হাজার কোটি ডলারের অধিক বিনিয়োগ করছে। 

ভদ্রমহিলা ও মহোদয়বৃন্দ, ভারত ও বাংলাদেশ সভ্যতার যোগসূত্র বহন করে এবং সংস্কৃতি, ভাষা, ইতিহাসের ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ। আমাদের অনন্য ও বিশেষ সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে জনগণে-জনগণে যোগাযোগ। গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার অভিন্ন মূল্যবোধের জন্য আমরা ১৯৭১ সালে আপনাদের মুক্তিযুদ্ধে একযোগে লড়াই করেছি। মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ বিসর্জনকারী ভারতীয় সৈন্যদের নিকটাত্মীয়দের সম্মান জানানের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনন্যসাধারণ সৌজন্য ভারতের ১শো ২৫ কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। আমাদের সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধারা অপরিসীম ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি এবং বিশেষ সৌজন্য হিসেবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী অতিরিক্ত ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা বৃত্তি (বাংলাদেশী টাকায় ৪৬ কোটি) প্রদান; ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে বছরে ১০০ মুক্তিযোদ্ধাকে বিনামূল্যে চিকিৎসাদান এবং তাঁদের জন্য ৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদী মাল্টিপল ভিসা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন। 

আমাদের দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বন্ধন সর্বস্তরে প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক বিনিময়, মতবিনিময় ও প্রশিক্ষণ বিনিময়ের মাধ্যমে বৃদ্ধি পেয়েছে। গুণগত ও পরিমাণগত উভয়ক্ষেত্রেই আমাদের সার্বিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত তৎপরতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিরক্ষা বাহিনির প্রধানদের পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ এবং তিন বাহিনির স্টাফদের বার্ষিক আলোচনা এ ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রেখেছে। অনেকগুলি নতুন যৌথ মহড়া শুরু হয়েছে এবং বিদ্যমান মহড়াগুলির মানোন্নয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনির প্রশিক্ষণ পদ বৃদ্ধি এবং শুভেচ্ছা সফরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে আমাদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এটিই কোন ভারতীয় সেনাপ্রধানের প্রথম  সফর। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরকালে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামো সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে অন্যান্য দলিলের বিনিময় দুই দেশের মধ্যে সংশ্লিষ্ট এনডিসিবৃন্দ; এখানকার ডিফেন্স সার্ভিসেস্ স্টাফ কলেজ এবং ভারতের ডিফেন্স সার্ভিসেস্ কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজ এবং ভারতের টাটা মেডিক্যাল সেন্টার ও বাংলাদেশের ডিরেক্টর জেনারেল মেডিক্যাল সার্ভিসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানিক সহযোগিতার একটি শক্তিশালী ভিত্তি রচনা করছে। 

ভদ্রমহিলা ও মহোদয়বৃন্দ, ভারত বাংলাদেশের এক নিবেদিতপ্রাণ উন্নয়ন অংশীদার। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নতদেশে পরিণত হওয়ার জন্য আপনাদের ভিশনের আমরা সর্বাত্মক সমর্থক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরকালে ভারত ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের বিশেষ সুবিধানজনক আর্থিক সহায়তার অঙ্গীকার করেছে। এতে ৩০০ কোটি ডলারের প্রথম এবং দ্বিতীয় ঋণরেখা মিলিয়ে মোট ৮০০ কোটি ডলার দাঁড়াল। 

এই সফরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক এবং নতুন উচ্চ-প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে সহযোগিতার সাম্প্রতিক তৎপরতা কৌশলগত ও নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি নিরাপত্তা, মহাকাশ, সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি সহযোগিতা এসবের অন্তর্ভুক্ত। এসব ক্ষেত্রের শক্তিশালী উন্নয়ন মাত্রা রয়েছে, যেহেতু জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতার উপকার হচ্ছে চূড়ান্ত লক্ষ্য। উদাহরণস্বরূপ, মে মাসে আমরা দক্ষিণ এশিয়া উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছি যা বাংলাদেশসহ অংশগ্রহণকারী দেশসমূহের টেলিযোগাযোগ, টেলিমেডিসিন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অধিকতর সহযোগিতার সেবাসহ বহুমাত্রিক সুবিধা প্রদান করবে। 

উভয় দেশের সহযোগিতায় সবচেয়ে গুরুত্বের জায়গা হল যোগাযোগ। যোগাযোগ আমাদের নিজস্ব প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে প্রথম নীতির অংশ। এটি একইসঙ্গে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা ও প্রবৃদ্ধি এবং আমাদের উভয় দেশের উন্নয়নের জন্য জরুরি। আমরা সকল রেলওয়ে সংযোগ পুনঃস্থাপন করার চেষ্টা করছি, যা ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমরা নতুন রেলওয়ে সংযোগ বৃদ্ধিরও চেষ্টা চালাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরকালে রাধিকাপুর ও বিরলের মধ্যে ৪র্থ রেলওয়ে সংযোগটি (পূর্বতম ৬টি রেলওয়ে সংযোগের অন্যতম) দুই প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেছেন। ২০১৮ সালের মধ্যে আরও ৩টি রেলওয়ে সংযোগের কাজ শেষ হবে। আমরা খুলনা ও কলকাতার মধ্যে নতুন যাত্রীবাহী ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ চালু করতে যাচ্ছি। এর পরীক্ষামূলক চলাচল ইতোমধ্যে হয়ে গেছে এবং বিদ্যমান মৈত্রী এক্সপ্রেসে দুই প্রান্তে বিধিবদ্ধ চেকিং সার্ভিস সম্পন্ন হলে ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে ভ্রমণের সময় লক্ষ্যণীয়ভাবে কমে যাবে। কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা এবং ঢাকা-শিলং-গৌহাটির অতিরিক্ত খুলনা ও কলকাতার মধ্যে একটি নতুন বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। 

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিখাতে সহযোগিতা গত কয়েক বছরে অনেক বেড়েছে। সরকারি-বেসরকারি উভয়খাতে নানামুখী সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে যাচ্ছি। বর্তমানে ভারত থেকে বাংলাদেশে ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ইতোমধ্যে সঞ্চালিত হচ্ছে (পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা থেকে)। মঞ্জুরি সহায়তার অর্থায়নে আমরা এলএনজি সরবরাহ; ভারত ও বাংলাদেশের ঝিনাইদহ-খুলনার মধ্যে গ্যাস গ্রিড আন্তঃসংযোগ; কুতুবদিয়ায় আইওসিএল-এর একটি এলপিজি ইম্পোর্ট টার্মিনাল স্থাপন; এলপিজি পাইপলাইন নির্মাণ; এবং শিলিগুড়ি থেকে পার্বতীপুরে গ্যাসওয়েল সরবরাহে একটি মৈত্রী পাইপলাইন নির্মাণ করতে যাচ্ছি। 

বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান ক্ষেত্র। যেহেতু বাংলাদেশ তার বিদ্যুৎ ক্ষেত্রকে বহুমুখী করতে চাচ্ছে এবং রূপপুরে তার প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ করতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরকালে বেসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি ক্ষেত্রে ৩টি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। আমরা জলবিদ্যুৎ এবং ভুটানের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার জন্য যৌথ বিনিয়োগের উদ্যোগ নিচ্ছি। 

আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে বহুবিধ উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আমাদের উন্নয়ন কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে চলেছি। এর সাম্প্রতিক কয়েকটি উদাহরণ হচ্ছে আমাদের স্মার্ট সিটিজ উদ্যোগের আলোকে রাজশাহী, খুলনা ও সিলেটে নগর উন্নয়ন প্রকল্পে ভারতের সহায়তা। 

আমরা বিদ্যুৎ দক্ষতা বিষয়েও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছি এবং ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে ১০০০০ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এলইডি বাল্ব স্থাপনের একটি পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। 

আমরা নতুন একটি ঋণরেখার আওতায় বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প যৌথভাবে হাতে নিতে যাচ্ছি, এটি আমাদের নিজস্ব নমামি গঙ্গা প্রকল্পের অনুরূপ। আমরা শুধু অবকাঠামো উন্নয়নে আমাদের অংশীদারিত্ব চাই না, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও চাই এবং বাংলাদেশে ৩৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন। 

ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ, আমাদের সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম এবং আমরা সঠিক পথেই চলছি। আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মডেল। আমরা শুধু আমাদের সব অমীমাংসিত সমস্যা বাস্তবোচিতভাবে সমাধান করিনি, বরং আমাদের উভয় দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছি এবং আমাদের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে নিবেদিত রয়েছি। আমাদের জনগণে-জনগণে বন্ধন অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। ভিসা উদারিকরণে আমাদের উদ্যোগে লক্ষণীয় ফল পাওয়া গেছে। বিদেশি পর্যটক আগমনের সাপেক্ষে আজ বাংলাদেশের পর্যটকরা ভারতের এক নম্বর পর্যটনকারী। এ বছর জুন মাস নাগাদ (ছয় মাসে) মানুষ বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ১৩ লাখের বেশিবার যাতায়াত করেছে। আমাদের দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক বিভিন্ন ক্ষেত্রে অপরিসীম এবং এটা ধরে রাখতে আমরা পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। 

****

 

 
 
 


ঠিকানা: ভারতীয় হাই কমিশন
প্লট নং. ১-৩, পার্ক রোড, বারিধারা, ঢাকা-১২১২
কর্ম ঘন্টা: সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫:৩০ মিনিট পর্যন্ত
(রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত)
টেলিফোন নম্বরসমূহ: +৮৮০-২-৫৫০৬৭৩৬৪
ইপিএবিএক্স: +৮৮০-২-৫৫০৬৭৩০১-৩০৮ এবং +৮৮০-২-৫৫০৬৭৬৪৫-৬৪৯
ফ্যাক্স নম্বর: +৮৮০-২-৫৫০৬৭৩৬১